ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ: বাঙালিত্বের নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ

নাজিয়া আফরোজ অনন্যা

১৮৯৫ সালের দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন ‘১৪০০ সাল’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথ বেশ বিস্ময় ও এক সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লিখেছিলেন যে, “আজি হতে শতবর্ষ পরে / কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি / কৌতূহলভরে / আজি হতে শতবর্ষ পরে।”

পাকিস্তানি ঘাতকরা যখন প্রথম থাবা বসায় আমাদের মাতৃভাষাটিকেই বদলে দেবার জন্য, আমরাও রবীন্দ্রনাথের মতো বিপন্ন বিস্ময়ে উচ্চারণ করেছিলাম- তবে কি আজ থেকে আর রবীন্দ্র পড়ব না? ১৯৬৭ সালের ২২শে শ্রাবণের (কবিগুরুর প্রয়াণ দিবস) পূর্ব মুহূর্তে রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী মনে করতো, রবীন্দ্রসংগীত প্রচার এবং পহেলা বৈশাখ উদযাপন হিন্দু সংস্কৃতির অংশ। এমন বিচ্ছিন্ন অনেকগুলো ঘটনা বাঙালিকে একত্র করেছিলো যাতে বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি, সাহিত্য, কিংবা ভাষাটি এভাবে সমূলে লোপাট হয়ে না যায়।

ভাষা আন্দোলনের দিন হিসেবে আমরা ১৯৫২-কে জানলেও তা মূলত শুরু হয়ে গিয়েছিলো সেই ১৯৪৮-এর ২১শে মার্চ যখন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গের মাটিতে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, “Urdu and Urdu shall be the only state language of Pakistan” কিন্তু উর্দু শিখলে বাঙালির অর্থনৈতিক বা সার্বিক কোন উন্নতি হত কি? নাকি কেবল পশ্চিম পাকিস্তানীদেরই স্বার্থসিদ্ধি হত এবং উর্দুতে কথা বলতে না পারায় বাঙালিরা চাকরিচ্যুত হচ্ছিলো? অথচ বাঙালিরা ভাষাভাষীর দিক থেকে ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবুও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা অগণতান্ত্রিক। উপরোক্ত প্রশ্ন, অধিকার সচেতনতার আত্মপলব্ধি এবং আরো নানা ধরণের শাসন-শোষণের তোপের মুখে বাঙালির যে আন্দোলন শুরু হয় তারই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তির অবিরাম সংগ্রামের ফলে আমরা আজ শতবর্ষ পরেও স্বাধীন বাংলায় বসে বাংলা ভাষায় রবীন্দ্র, নজরুল, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, কিংবা আসাদ চৌধুরী পড়ছি বা শুনছি।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম কবে, কিভাবে ঘটলো তার ফলাফলই বা কি সে ইতিহাস আমরা সকলেই জানি। তবে এই দীর্ঘযাত্রা কিভাবে বাঙালিত্বের নতুন সংজ্ঞা বিনির্মাণ করলো তা বোঝার জন্য প্রথমেই এই প্রশ্ন করা দরকার যে বাঙালিত্ব কী? সর্বজনীন ও সহজভাবে বললে এর উত্তরটা লুকিয়ে রয়েছে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার মাঝেই। এছাড়াও হাজার হাজার বছরের ধারাবাহিকতায় সাংস্কৃতিক, বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী, নানা শ্রেণির মানুষ, বাংলা ভাষায় কথা বলা, ভাবের আদান-প্রদান করা, সাহিত্য রচনা করা, জীবন ও আত্মার পুষ্টিলাভের জন্য বাংলার চিরাচরিত সঙ্গীত ও শিল্পকলাকে প্রধান রসদ মনে করা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাকরীতি ইত্যাদির সহবস্থানই মূলত বাঙালিত্ব। কেবলমাত্র একই ধাঁচের উপাদান নয়, বিভিন্ন উপাদানের সহবস্থান ও সমন্বয়ও বহন করে বাঙালিত্বের পরিচয়।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালির যে ইতিহাস তা ধর্মনিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠার ইতিহাস। কিন্তু এর আগে বাঙালির বাঙালিয়ানার ইতিহাসটি কেমন ছিলো তার একটি পর্যালোচনা প্রয়োজন। উনিশ শতক থেকে বিংশ শতাব্দীতে অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গ এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত বাঙালি মুসলমান এবং হিন্দুদের মাঝে একপ্রকার বিচ্ছিন্নতাবোধ দেখা যেতো। মুসলমান মোল্লারা বলতে শুরু করলেন, “বাংলা ভাষায় যে সব মুসলমান লেখালেখি করবে এবং বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করবে তারা ইসলাম ধর্ম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। এদের ‘বিবি’ তালাক হয়ে যাবে। এদের সন্তানরা হবে জারজ।” সিরাজুল ইসলামের ‘ঐতিহাসিকের নোটবুক’ থেকে এটি জানা যায়। এ প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমরও তার প্রবন্ধ ‘মুসলমানদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে’ বলেছেন, তারা আরব-ইরানের যেই স্বপ্নে বিভোর ছিল তা থেকে বের হয়েছে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। তার ভাষায় এটা বাঙালির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। বাংলাভাগের আগে একশ্রেণির মুসলমান আরবি-ফারসি ভাষা এবং সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বলে নিজেদের গণ্য করতেন। কেননা সেসময়ে বাঙালি বলতে মানুষ কেবল বাংলাভাষী হিন্দু বুঝত আর মুসলমানরা ভাবতো তাদের স্বদেশ মধ্যপ্রাচ্য এবং তাদের মাতৃভাষা ফারসি নয়তো উর্দু। পাকিস্তানি শাসকদের হাত থেকে মুক্তি পেতে নিজেদের ভাষাগত পরিচয়কে বড় করে তোলা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না তাদের। মীর মশাররফ হোসেনও একই ধারণা পোষণ করতেন যা তার লেখা ‘এ দেশের মুসলমানেরাও বাঙ্গালী’ নিবন্ধে দেখা যায়। উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের একটি অংশ যখন মাতৃভাষা ও জাতীয়তার প্রশ্নে বিভ্রান্ত এবং বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত তখন এই মানসিকতার বিপক্ষে প্রথম কলম যুদ্ধ শুরু করেন মীর মশাররফ হোসেন যার নানাবিধ প্রমাণ পাওয়া যায় তার সম্পাদিত আজীজন নেহার (১৮৭৪) পত্রিকায় বাঙালিত্ব ও মাতৃভাষা বিষয়ক অনেক লেখায়।

কেবল মুসলমানদের মধ্যেই যে বাংলা ভাষার প্রতি এমন বৈরি মনোভাব দেখা যেতো তা নয়। ভাষার প্রশ্নে বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম উভয়েই ছিল বিভক্ত। যা আঠারো থেকে উনিশ শতাব্দীর  বাঙালি ইতিহাস সংক্রান্ত বই ‘বেঙ্গল ডিভাইডেড’-এ দেখতে পাওয়া যায়। এই বইয়ের লেখিকা জয়া চ্যাটার্জি তার লেখায় বলেছেন উল্লেখিত সময়ের মধ্যে ‘ভদ্রলোক’ কালচার গড়ে ওঠে বাংলায়। এই ভদ্রলোক কালচারে এক শ্রেণির হিন্দু নিজেদেরকে ‘মোস্ট কালচারড’ এবং ‘বেঙ্গল রেনেসার’ অংশ বলে বিবেচনা করতো। যারা কিনা শিল্প, সাহিত্যে নিজেদেরকে অন্য ধর্ম বা বর্ণের থেকে সমৃদ্ধ মনে করতো। পরবর্তী সময়ে এক ধরণের ভদ্রলোক সাম্প্রদায়িকতা দেখা দেয় কিন্তু ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিতে তা আসেনা কেননা সাম্প্রদায়িকতা বলতে কেবল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাই বুঝাতো এবং মুসলিমদেরকে সবথেকে বেশি সাম্প্রদায়িক বিবেচনা করা হতো সে সময়ে। কেবল মুসলমানরাই যে এই ভদ্রলোক কালচার থেকে বাদ পড়েছিলো তা নয় বরং নিম্নবর্গের হিন্দুরাও বাদ পড়ে যাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অভাব ছিল। অর্থাৎ নিজ সম্প্রদায়ের ভেতরেও এক ধরণের বিভাজন তৈরি করেন তারা। এর কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে জয়া চ্যাটার্জি শরৎচন্দ্রের ‘বর্তমান হিন্দু ও মুসলমান সমস্যা’ থেকে উল্লেখ করে বলেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদ একটি সাম্প্রদায়িক সমস্যা কেননা তাদের মতে মুসলমানরা কখনোই তাদের মতো সহ্যশক্তি, ভদ্রতা কিংবা আধ্যাত্মিকতা অর্জন করতে পারেনি। তিনি আরো বলেন যে, বাংলাভাগের সিদ্ধান্তও মূলত কোন মুসলিম সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি কংগ্রেসের পক্ষ থেকে হিন্দু স্বার্থ রক্ষার্থে গৃহীত। শিল্প-সাহিত্যের দিকটি যেমন ভাষার প্রশ্নে বিভাজন তৈরি করেছিলো বাঙালিদের ভেতরে ঠিক তেমনি ধর্মীয় দিকটিও এক কালে বিভাজন তৈরি করেছিলো। যদিও পরবর্তীতে তা আমূলে পরিবর্তন হয়। গোলাম মুরশিদের লেখা ‘বাংলা ভাষার উদ্ভব অন্যান্য’-তে দেখা যায় যে এক সময়ে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা ফতোয়া দিয়ে বলেছিলেন, “দেশীয় ভাষায় রামায়নসহ হিন্দু পুরাণ শুনলে অথবা শোনালে তাঁদের জায়গা হবে রৌরব নরকে।” অর্থাৎ ধর্মীয় কারণে হিন্দু সমাজও বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিতে দ্বিধান্বিত হয়নি। হিন্দু ও মুসলিম বাঙালিদের বিচ্ছিন্নতাবোধের যথোপযুক্ত কারণও রয়েছে। যা তাদের বাঙালিত্ব চর্চার একটি বড় অন্তরায় ছিলো। সাম্প্রদায়িক কারনেই যে কেবল এই দুই শ্রেণীর মানুষ বাংলা ভাষা কিংবা সংস্কৃতিকে অস্বীকার করতো তা নয়। আভিজাত্য অর্জনের চেষ্টা বা এই বোধও কিছু ক্ষেত্রে তাদের বিচ্ছিনতাবোধের কারণ।

ভাষা আন্দোলনের ফলে ভাষা এবং সংস্কৃতির রূপান্তরের পাশাপাশি পহেলা ফাল্গুন, নববর্ষ, রাষ্ট্রভাষা দিবসের মতোন ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবগুলো পালন শুরু হয়। যা কিনা আন্তর্জাতিক মহলে বাঙালিত্বের অনেক বড় একটি পরিচায়ক বর্তমান বাংলাদেশে। এছাড়াও যে সকল বাঙালি মুসলমানেরা বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করতেন তাতে শৈল্পিক এবং দার্শনিক সৃষ্টি থাকলেও তার তাৎপর্য দাবী করতে পারেন না বলে মনে করতেন আহমদ ছফা। তিনি এর পেছনে যে কারণ মুখ্য বলে উল্লেখ করেন তার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে তা হল বাঙালি মুসলমানের মনের প্রসারহীনতা এবং চিন্তা শক্তির অভাব। এর কারণ অবশ্য তিনি মনে করেন, বাঙালি মুসলমানেরা রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করার অধিকার কখনো পায়নি। একটি রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে একটি সমাজ বিশ্ব সমাজের অংশে পরিণত হয় এবং বিশ্বসভায় একটি আসন অধিকার করে। যদিও আমরা একাত্তরে একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনা শুরু করেছি।

ধর্মীয় পরিচয়ে ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যে ব্রিটিশভারত ভাগ হয়েছিলো তাতে পাকিস্তানে যারা যোগ দিয়েছিলো তারা পরবর্তীতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের শাসন ও শোষণের ফলে নিজস্ব মাতৃভাষার ওপরে বেশি জোর দিয়েছিলো। তবে দ্বিজাতিতত্ত্ব বৃটিশ কিংবা পাকিস্তানিদের নতুন আবিষ্কৃত কোনো মতাদর্শ নয়। বাংলাভাগেরও বহু পূর্বে জেমস মিলের ইতিহাস চর্চার যে ধরণ তাতে দ্বিজাতিতত্ত্বের বীজ লুকিয়ে রয়েছে। এ অঞ্চলের ইতিহাসকে হিন্দু, মুসলিম এবং ব্রিটিশ তিনটি আলাদা ভাগে ভাগ করেন মিল। মিলের মতে ভারত হিন্দু এবং মুসলিম দুটি জাতি নিয়ে গঠিত। ব্রিটিশ শাসনামলে সংখ্যালঘু মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে এবং হিন্দুদের পাশাপাশি ভারতীয় সভ্যতাও মুক্ত হয়। এই দুটি তত্ত্বকে সমর্থন করার জন্য মিল ভারতীয় ইতিহাসকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছিলেন মূলত। এই তত্ত্বগুলি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির ‘বিভাজন ও শাসন নীতি’ ধরে রাখার পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ তৈরিতে সহায়তা করেছিল। তার লেখা ‘হিস্ট্রি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়াতে’ এর উল্লেখ রয়েছে।

ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতে, মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ কাজ করে তার বিভিন্ন পরিচয়ের ভিত্তিতে যেমন তার ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী, অর্থনৈতিক অবস্থা, লিঙ্গ, যৌন আচরণ ইত্যাদি। সমাজের কাছ থেকে তাদের এই পরিচয়ের স্বীকৃতি পাবার চলমান আকাঙ্ক্ষা পরিণত হয় আত্মমর্যাদাবোধে। ফুকুয়ামার এই তত্ত্ব অনুযায়ী দেখলে মুসলমান ও হিন্দু উভয়ের মাঝেই এক প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ ছিলো। তবে তা একপাশে সরিয়ে রেখে কেবল ‘বাঙালি’ রূপে এক হয়ে তারা একবার তাদের ভাষাটিকে অর্জন করে আর পরবর্তীতে এক হয়ে অর্জন করে স্বাধীনতা। এটি কখনই সম্ভব হয়ে উঠত না যদি বাঙালি মুসলমান কিংবা হিন্দুরা জাত্যাভিমান ভুলে অসাম্প্রদায়িক না হয়ে উঠতো এবং নিজেদের কেবল হিন্দু-মুসলমান মনে করতো। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালির যে অসাম্প্রদায়িক রূপ আমরা দেখেছি।

আমাদের উপমহাদেশ ভাগ হয়েছিলো ধর্মের ভিত্তিতে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠনের মূলমন্ত্র ছিল ধর্ম ও রাজনীতিতে ইসলামকে সংকীর্ণভাবে ব্যবহার করা। কিন্তু পাকিস্তানের এই রাষ্ট্র ধারণার বিপরীতে আমরা গড়ে তুললাম একটি ভাষাভিত্তিক জনমত এবং জনঐক্য। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ প্রায় দুই দশক ধরে বাঙালির আন্দোলনের দাবীগুলোর মধ্যে অন্তর্নিহিত ছিল বাঙালির আদর্শ, মূল্যবোধ, এবং স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন। তবে ১৯৪৭ অর্থাৎ বাংলাভাগের  পর্যন্ত পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা ‘বাঙালি’ ধারণাটির সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন না করতে পারলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার সেই জনগোষ্ঠীই তার রাজনৈতিক লড়াই, অর্থনৈতিক মুক্তি, এবং ভাষার অধিকারের অংশ হিসেবে বাঙালিত্বের ধারণাটিকে আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র করে তোলে। ১৯৬০-এর দশকে আমরা দেখেছি কিভাবে রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা বাঙালিত্বকে ধরে রেখেছি। আমাদের সবচাইতে বড় পরিচয় আমরা বাঙালি। এর চাইতে বড় পরিচয় আমাদের আর নেই। আমাদের এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার সমৃদ্ধির পেছনে ষাটের দশকের বিভিন্ন আন্দোলন, ভাষা ও মুক্তির আন্দোলন এক অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করেছে। যার ফলস্বরূপ আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, সহ সকল ধর্মের মানুষ একাত্তরের মিছিলে রাজপথের স্লোগানে সমসুরে উচ্চারণ করেছিলাম, ‘তুমি কে, আমি কে / বাঙালি, বাঙালি’ অথবা ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারের সুরে সুরে গেয়েছিলাম ‘তোমার আমার ঠিকানা / পদ্মা, মেঘনা, যমুনা।’ আর এরই ধারাবাহিকতায় বাঙালিত্বের এক নতুন সংজ্ঞা বিনির্মাণ হলো।