আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ’৭১-এর গণহত্যার বিচার: সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ

কবীর চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা-১৩ ও আলোচনা সভা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ’৭১-এর গণহত্যার বিচার: সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ

ব্যরিস্টার তাপস কান্তি বল, প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশ

০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, বিকাল ৩টা

কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তন, জাতীয় জাদুঘর

 

সমাগত সুধীজন। সম্মানিত প্রধান অতিথি, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি মাননীয় বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং সম্মানিত সভাপতি।  বক্তব্যের শুরুতেই  বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, আহত মুক্তিযোদ্ধা, এবং সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।  কবির চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা দেয়ার জন্য ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন।  এজন্য ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’-র সকলকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

আমাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয় যে, কবীর চৌধুরীর স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা জন্মগ্রহণ করেছি।  দূর্ভাগ্য যে, তাঁর সান্নিধ্যে কাজ করার বিরল সুযোগ আমাদের প্রজন্মের পাওয়া হলো না। কবীর চৌধুরী এমন একটা সময় যুদ্ধপরাধী-মানবতাবিরোধীদের বিচার দাবি করেছিলেন, যখন এসব জল্লাদদের বিচার দাবি করার বিষয়টিকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হত। ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানার ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কর্তৃক গণহত্যাকারীদের বিচারের জন্য স্থাপিত গণআদালতে বিচারকের ভূমিকা পালন করেন তিনি। যুদ্ধাপরাধী বিচার আন্দোলনে এ মানুষটির দ্ব্যর্থহীন ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নির্ভীক কবীর চৌধুরী আমাদের সাহসের উৎস ছিলেন।  তাই আজ তাঁর নামে প্রবর্তিত স্মারক বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ পেয়ে শ্লাঘা অনুভব করছি।  কবীর চৌধুরীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আমি আমার সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা শুরু করছি।

সুধীমন্ডলী, আজকের বক্তব্যের মূল উপজীব্য হচ্ছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ। সংগত কারণেই, আন্তর্জাতিক অপরাধের সংজ্ঞা, ইতিহাস এবং ক্রমবিকাশ আজকের বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে থাকবে।  একই সাথে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়েও আমাদের আলোচনা হবে।

তবে আজকের আলোচনার মুখ্য বিষয় হচ্ছে – বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, যার অধীনে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর হিসেবে পরিচিত শান্তি বাহিনী, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, ও আল-মুজাহিদ কর্তৃক সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধ, যেমন: মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, শান্তি বিরোধী অপরাধ (যা বর্তমানে ‘Aggression’ নামে আইসিসি সংবিধিতে সংজ্ঞায়িত) ইত্যাদি,-এর বিচার ও তদন্ত চলমান রয়েছে। ৫০ বছর আগে সংঘটিত এসব অপরাধের  বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর্বটি ছিলো অত্যন্ত বন্ধুর। আমার বক্তব্যে এই বিচার প্রক্রিয়ার শুরুর দিকের ইতিহাস ও চ্যালেঞ্জ যেমন আলোচিত হবে, তেমনি আলোচিত হবে এর সফলতার পর্বগুলোও। অনেকেই প্রশ্ন করেন – এই বিচার কবে শেষ হবে? কিংবা কীভাবে শেষ হবে? বা শেষ হলে কী হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হবে আজকের বক্তব্যের একদম শেষদিকে।

১.

“আন্তর্জাতিক অপরাধ” শব্দটি আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন (International Human Rights Law) ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের (International Humanitarian Law) গুরুতর লঙ্ঘনকে সংজ্ঞায়িত করার একটি সম্মিলিত শব্দ। রোম সংবিধি অনুযায়ী চারটি অপরাধকে, যথা: গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও আগ্রাসনকে “আন্তর্জাতিক অপরাধ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

“আন্তর্জাতিক অপরাধ” ও “আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন” বা “আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন” শব্দসমূহ গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে পরিচিতি লাভ করলেও, এই ধরনের অপরাধের পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিলো অনেক আগে থেকেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের কিছু প্রাথমিক নজির বিদ্যমান ছিল। যাই হোক, যুদ্ধের পরেই একটি সত্যিকারের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ধারণা উদ্ভূত হয়। ভার্সাই চুক্তির অধীনে জার্মান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় উইলহেমকে বা কাইজারকে বিচার করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শেষ পর্যন্ত, বিচার সমাপ্ত না হলেও কাইজার নেদারল্যান্ডসে আশ্রয় খুঁজে পান ।

আন্তর্জাতিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের ক্ষেত্রে মূল পরিবর্তনটি আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। নুরেমবার্গের আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সরাসরি ব্যক্তি – বিশেষ করে, নাৎসি জার্মানির পরাজিত রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের ওপর প্রয়োগ করেছিল। এই যুগান্তকারী মুহূর্তটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের জন্মকে চিহ্নিত করেছে। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালে ১৯৪৫ সালে প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৯৪৬ সালে প্রথম রায় ঘোষণা করে। নুরেমবার্গ চার্টারের অধীনে তিনটি অপরাধের দায়ে, যথা: মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং শান্তি বিরোধী অপরাধ, অভিযুক্তদের বিচার হয়েছিলো।

জাপানে যুদ্ধাপরাধসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের জন্য একটি অনুরূপ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালটি ‘দূর প্রাচ্যের জন্য আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনাল’ নামে পরিচিত ছিলো- যা ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত পরিচালিত হয়েছিল। এই আদালতেও নুরেমবার্গের ন্যায় তিনটি অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার করা হয়েছিলো। এই আদালতে বাংলাদেশের (তৎকালীন ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষ) রাধা বিনোদ পাল বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর ভূমিকা জাপানের নাগরিকেরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে আজো স্মরণ করে থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কারণে জাপানের তৎকালীন সম্রাট বিচারের আওতামুক্ত থাকেন এবং অযাচিতভাবে বিচার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তীতে, ১৯৪৮ সালে জেনোসাইড কনভেনশনের মাধ্যমে গণহত্যা বা জেনোসাইডকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমগ্র মানবজাতি চাইছিলো সেই সকল দেশ ও ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে যারা যুদ্ধের নামে পৃথিবীর সকল সৃষ্টিকে ধ্বংস করার খেলায় মেতে উঠেছিলো। এরই  ধারাবাহিকতায় ১৯৫১ সালে আন্তর্জাতিক আইন কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হয় “Offenses against the Peace and Security of Mankind” প্রস্তুত করার জন্য, যার একটি খসড়া তারা প্রস্তুত করে ১৯৫৪ সালে। এই খসড়া আইনে দুটি বিষয়ের উপর তারা গুরুত্বারোপ করেন, যথা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ‘ব্যক্তি বিশেষ’ সংঘটন করে থাকে, রাষ্ট্র নয়, কারণ রাষ্ট্র ব্যক্তি কর্তৃক পরিচালিত, সে নিজে চালিত হতে পারে না এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার প্রতিটি দেশের জাতীয় আদালতে হওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইন কমিশন প্রথম খসড়া প্রস্তুত করবার সময়ই অনুধাবন করতে পেরেছিলো যে, বৃহৎ পাঁচ শক্তি কোনো দিন একমত হতে পারবে না এবং এই রাষ্ট্রসমূহ একত্রিত না হলে, একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠন সম্ভব নয়।

দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে ১৯৯৬ সালে চূড়ান্ত খসড়াটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। উল্লিখিত খসড়াটিতে দুইটি প্রস্তাব রাখা হয়: ক) আগ্রাসন, গণহত্যা, মানবতা বিরোধী অপরাধ, জাতিসংঘ এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার সুপারিশ করা হয় এবং খ) একটি শক্তিশালী ও কার্যকর আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করার ওপর জোর দেয়া হয়।

সর্বশেষ সুপারিশটি ‘১৯৫৪ সালের জাতীয় আদালতে’ আন্তর্জাতিক অপরাধে বিচারের সুপারিশের সম্পূর্ণ বিপরীত। এর কারণও ছিলো। ১৯৫৪ সালের পর সারা পৃথিবীতে অনেকগুলো রাষ্ট্র তাদের ঔপনিবেশিক শক্তিদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছিলো এবং বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ চলছিলো। উদাহরণ হিসেবে ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু হওয়া কম্বোডিয়ার গৃহযুদ্ধের কথা উল্লেখযোগ্য।  ৯০-এর দশকে রুয়ান্ডার (১৯৯৪) গৃহযুদ্ধ ও তৎকালীন ইউগোশ্লাভিয়ার (১৯৯০) সংঘটিত যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ নিরস্ত্র-নিরীহ মানুষ আন্তর্জাতিক অপরাধ, বিশেষ করে – গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের শিকার হয়। এই দুইটি যুদ্ধে লাখ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে বিচারের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃবৃন্দের বিচার নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ দুইটি হাইব্রিড ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে, যথা: ১৯৯৩ সালে স্থাপিত ইউগোশ্লাভিয়া ট্রাইব্যুনাল ও ১৯৯৫ সালে স্থাপিত রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল।

রুয়ান্ডা এবং ইউগোশ্লাভিয়ার অর্ন্তভুক্ত বলকান রাষ্ট্রগুলোতে সংঘটিত অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় ১৯৯৮ সালে রোম সংবিধি রচিত হয়, যার অধীনে ২০০২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তার যাত্রা শুরু করে এবং বর্তমানে ১২৩টি সদস্য রাষ্ট্র এই সংবিধির প্রতি তাদের অনুসমর্থন ব্যক্ত করেছে।  ১৯৫৪ সালে আন্তর্জাতিক আইন কমিশন যে শংকা প্রকাশ করেছিলো, রোম সংবিধি অনুসমর্থনের ক্ষেত্রে সেই আশংকাটিই সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। বৃহৎ পাঁচটি শক্তির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন এই সংবিধি সমর্থন করেনি। এই তিনটি দেশের পদাংক অনুসরণ করে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক শক্তিধারী রাষ্ট্র, যেমন: ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া, ইসরায়েল ইত্যাদি ও নাগরিকদের মানবাধিকার লংঘনের দায়ে অভিযুক্ত রাষ্ট্র, যেমন: মায়ানমার, রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করেনি। এইসব দেশের সমর্থন না করার কারণে গত বিশ বছরে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করা সম্ভব হয়নি।

২.

বক্তৃতার এ পর্যায়ে আজকের মূল আলোচ্য বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আলোচনা করব। আমরা সকলেই জানি – পাক হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় ৩০ লক্ষ নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, ২ লক্ষের অধিক মা-বোন হারিয়েছেন তাদের সম্ভ্রম, লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন আহত এবং ১ কোটির বেশি মানুষ হয়েছিলেন উদ্বাস্তু।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দুইটি পক্ষ আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত করেছিলো। একটি পক্ষ ছিলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং অপরপক্ষ ছিলো হানাদার বাহিনীর দেশীয় দোসর জল্লাদ বাহিনী, যারা শান্তি বাহিনী, রাজাকার বাহিনী, আল-বদর, আল-শামস ও আল-মুজাহিদ বাহিনী নামে পরিচিত ছিলো। এসব দোসরদের বেশিরভাগই ছিলো জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলীম লীগ প্রভৃতি ডানপন্থী ধর্মভিত্তিক দলের নেতা ও কর্মী। এরা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এবং হানাদার বাহিনীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই দোসরদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা আরো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরবে ট্রাইব্যুনালের রায়সমূহ।

বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে ভিকটিমদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য, বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য এবং যুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রথমত: ১৯৭২ সালে পাক হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোসরদের বিচারের জন্য তাঁর নেতৃত্বে ‘Bangladesh Collaborators (Special Tribunal) Order, 1972’ পাস করা হয় এবং সারা দেশের দায়রা আদালতগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দেশীয় দালালদের বিচার শুরু করেন। দ্বিতীয়ত: ১৯৫৪ সালে আন্তর্জাতিক আইন কমিশন প্রস্তাবিত ‘জাতীয় ট্রাইব্যুনাল’ স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশে আটক পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সামরিক উর্ধ্বতন নেতৃত্ব এবং সামরিক সদস্যদের বিচারের জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তৎকালীন জাতীয় সংসদ ‘International Crimes (Tribunals) Act, 1973’ পাস করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই আইনটি অস্ট্রিয়ার প্রফেসর অটো ট্রিফটারার-সহ ভারত ও বাংলাদেশের বিজ্ঞ আইনজ্ঞগণ কর্তৃক রচিত হয়েছিলো; এবং তৃতীয়ত, যারা ‘পেটি ক্রাইম’ বা ‘ছোটো-খাটো অপরাধ করেছিলো, তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন যে, বঙ্গবন্ধু কখনোই হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, ও লুটপাটের সাথে জড়িত কারো জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করেননি।

International Crimes (Tribunals) Act, 1973 (আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩) নুরেমবার্গ চার্টার অনুসরণ করে রচিত হয়েছিলো। নুরেমবার্গ চার্টারে সংজ্ঞায়িত মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও শান্তিবিরোধী অপরাধের সাথে গণহত্যা, জেনেভা কনভেনশনসমূহ-সহ সকল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনসমূহের লঙ্ঘন অপরাধ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে এই আইনটিতে। নুরেমবার্গ চার্টারের মতন একজন ব্যক্তিকে তার নিজের কাজের জন্য, উর্ধ্বতন বা সুপেরিয়র ভূমিকার জন্য এবং সর্বোপরি, তার দলগত কাজের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের এই আইনটিতে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিলের ব্যবস্থা রয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া বেগবান করার জন্য দেশের প্রচলিত সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধির ব্যবহার বারিত করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলাগুলোর ক্ষেত্রে। এমনকি আইনে না থাকলেও, আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ দায়ের করার অধিকার দেয়া হয়েছে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে।

২০০৯ সালে যখন বিচার শুরু হল, তখন জামায়াত ইসলামী ও বিএনপি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করে বিশ্বের নামী-দামী আইনজীবী ও অধ্যাপকদের কাছ থেকে মতামত সংগ্রহ করে প্রচার করলো ১৯৭৩ সালের আইনে ভূতাপেক্ষ অপরাধের বিচারের সুযোগ নেই এবং এধরনের বিচার ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক সনদের ১৫(১) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। নামী-দামী আইনজীবী ও অধ্যাপকেরা একই সনদের ১৫(২) অনুচ্ছেদে যে ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ আছে – সেটি আর প্রকাশ করতে চাইলেন না। ১৫(২) অনুচ্ছেদে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে যে, অপরাধ সংঘটনের সময় যদি, অপরাধ বিশ্বের অন্য কোনো দেশে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়ে থাকে, তাহলে তার বিচার পরবর্তী সময়ে আইন করে সম্পাদন করা যাবে। একই মতামতে ‘বিশেষজ্ঞরা’ আরো বললেন যে, এই আইনের অধীনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কোনো অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষিত হবে না। এই মন্তব্যটি করার সময় তারা বললেন না যে এই ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অস্তিত্ব নেই। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক সনদের ১৪ অনুচ্ছেদে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বেশ কয়েকটি অধিকারের কথা বলা আছে, যেমন: নিজের পছন্দমত আইনজীবী নিয়োগের অধিকার, কী অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে সেটা অভিযুক্ত ব্যক্তির নিজের ভাষায় জানবার অধিকার, মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করে তদন্তকালীন জিজ্ঞাসাবাদ করা, আটক অবস্থায় তার স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও খাদ্যের অধিকার রক্ষা করা, বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক দাখিলকৃত সকল তথ্য-উপাত্ত-দলিল দস্তাবেজের কপি লাভের অধিকার, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীকে জেরা করবার অধিকার ইত্যাদি। জামায়াত-বিএনপির ভাড়া করা আইন বিশেষজ্ঞরা আমাদের ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তদন্ত এবং বিচারকালীন সময়ে এইসব অধিকার যে রক্ষিত হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দিলেন না।

সকলের জানা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়েও অধিক অধিকার অভিযুক্তদের দেয়া হয়েছে। অভিযুক্তরা বিচারকালীন ট্রাইব্যুনালে বসে ঘরের রান্না করা খাবার খেয়েছেন, সরকারি হাসপাতালে বিনা পয়সায় তাদের চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে, তাদের আইনজীবী নিয়োগের আর্থিক ক্ষমতা না থাকলে রাষ্ট্র নিজ খরচে ডিফেন্স ল’ইয়ার নিয়োগ দিয়েছেন, অভিযুক্তদের আত্মীয়-স্বজন আদালতে বসে বিচারকার্য পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন, রাষ্ট্রীয় খরচে রায়ের সার্টিফাইড কপি পেয়েছেন, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীগণ প্রতিটি সাক্ষীগ্রহণের আগে আলাদাভাবে টেক্সট করে ডিফেন্স আইনজীবীদের জানিয়েছেন, এবং ডিফেন্স আইনজীবীদের আলাদা বসার জায়গা ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে করে দেয়া হয়েছে। তদন্তকালীন জিজ্ঞাসাবাদের সময় একজন ডাক্তার এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীর উপস্থিতিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযুক্ত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। কোভিড পরবর্তী সময়ে বয়স এবং অসুস্থতা বিবেচনায় মানবিক কারণে আসামিদের জামিন দিচ্ছে ট্রাইব্যুনাল, যদিও আইনে জামিন দেয়ার সুযোগ নেই।

ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে আসা ভিকটিম ও ভিকটিম পরিবারের সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা। তাদেরকে চিহ্নিত করার জন্য আলাদা আই.ডি. কার্ড দেয়া হয়েছে এবং তাদের নাম ঠিকানা প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট থানার ইন্সপেক্টরকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে যখনই ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীরা নিরাপত্তা ঝুঁকি অনুভব করেছেন, তখনই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বীরাঙ্গনাদের সাক্ষ্যগ্রহণের সময় ক্যামেরা ট্রায়াল বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের পরিচয় গোপন রেখে আইনানুগভাবে বিচারকার্য সম্পাদন করা সম্ভব হয়েছে।

বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উৎকর্ষ লাভের কারণে কার্স্টেন সেলারস ট্রাইব্যুনাল ১ ও ২-কে “Asian Nuremberg” এবং “purest modern manifestation of the Nuremberg Project” বলে অভিহিত করেছেন; আর ব্যরিস্টার আমিরুল ইসলাম সম্পূর্ণ বিচার প্রক্রিয়াকে অভিহিত করেছেন “as a model of international due process” হিসেবে। শুধু তারাই নন। গ্যারি ব্যাস নুরেমবার্গের সাথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মিল খুঁজে পেয়েছেন এবং এই সাদৃশ্যকে “legalism’s greatest moment of glory” বলে উল্লেখ করেছেন এবং সুসানা লিনটন ১৯৭৩ সালের আইনটিকে “a progressive development of international criminal law” হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

৩.

কার্স্টেন সেলারস, সুসানা লিনটন কিংবা গ্যারি ব্যাস ১৯৭৩ সালের আইন ও ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্য সম্পর্কে প্রশংসাসূচক বক্তব্য দেয়ার পেছনে দুইটি কারণ রয়েছে। প্রথমত: ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা ও সাহসিকতা, দ্বিতীয়ত: এই কর্ম সম্পাদনের জন্য নিবেদিতপ্রাণ তদন্ত সংস্থার সদস্যবর্গের দক্ষতা, প্রসিকিউটরদের আন্তরিকতার সাথে তদন্ত সংস্থা কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে মাননীয় ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করে অভিযোগসমূহ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা এবং সর্বোপরি বিচারকদের আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। তৃতীয় আরেকটি কারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। হাইব্রিড আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যেখানে হাজার কোটি ডলার খরচ করে গুটি কয়েক অভিযুক্তদের বিচার শেষ করতে পেরেছে, সেখানে বাংলাদেশের জাতীয় ট্রাইব্যুনাল প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে আনুমানিক ২৫০ কোটি খরচ করে গত ১৩ বছরে ৫৪টি মামলার রায় প্রদান করেছে, যে মামলাগুলোতে মোট আসামির সংখ্যা ছিলো ১৪৮ জন, এর মধ্যে মোট সাজাপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ১৪৬ জন। এখন পর্যন্ত বিচার শেষে খালাস পেয়েছেন দুইজন এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ১০৬ জন। অন্যান্য আসামিরা আমৃত্যু থেকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। একজন প্রসিকিউটর হিসেবে শুধু এতটুকু বলতে পারি ২০০৯ সালে আমাদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা যতটুকু ছিলো, এখনো ততটুকুই আছে।  গর্বের সাথে বলতে পারি মাননীয় বিচারক, রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তাগণ, প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ সকল সাপোর্টিং স্টাফ বিশুদ্ধ দেশপ্রেমের জন্য দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলেছেন হেগের আদালতসহ অন্যান্য আদালতের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন দেশের বলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও ব্যক্তির সাথে একাত্মতা বোধ করেন না বলেই বিচার প্রক্রিয়াগুলো এত মন্থর গতিতে চলছে। এখানেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অসাধারণভাবে ব্যতিক্রম।

১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইতোপূর্বে, রুয়ান্ডার ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত আকায়েসু-র রায়ে ধর্ষণের মাধ্যমে গণহত্যা কিভাবে সংঘটিত হয় সে বিষয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করা হয়েছিলো, কিন্তু ভিকটিম ও নিরপেক্ষ সাক্ষীর সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে কীভাবে শাস্তি দেয়া যেতে পারে – সেই বিষয়টি পরিষ্কার ছিলো না। বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল এই বিষয়টিকে পরিষ্কার করে ধর্ষণের মাধ্যমে গণহত্যার অপরাধকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং ‘জেনোসাইডাল রেইপ’কে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল মো: এছাহাক সিকদার, মো: রিয়াজউদ্দিন ফকির এবং মো: ইদ্রিস সরদার ও অন্যান্য মামলায় জোনোসাইডাল রেইপের স্বীকৃতি দিতে গিয়ে বলেছেন যে, পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা ধর্ষণকে ‘গণহত্যা’র মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে (rape…effective tool of genocide)। ট্রাইব্যুনালের রায়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে, ধর্ষণের ফলে একজন নারীই শুধু নিগৃহীত হয় না, তার পরিবার, গোষ্ঠী, জাতি ও একটি দেশের প্রতিটি মানুষের মনে স্থায়ী ও গভীর আঘাতের চিহ্ন রেখে যায়। ধর্ষিতা নারীর মনোবলই শুধু নয়, তার পরিবার ও গোষ্ঠীর সকল সদস্যের মনোবলকেও সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস করে।

এই ট্রাইব্যুনালের রায়ে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কতটা ব্যাপকভাবে ধর্মভিত্তিক গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিলো – তার একটি চিত্র পাওয়া যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরকে বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বী অধ্যূষিত গ্রাম, প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় মঠ-মন্দির ছিলো পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের লক্ষ্যবস্তু। হিন্দু শিক্ষক, নেতা, প্রতিশ্রুতিশীল ছাত্র নেতা, সকল বয়সের নারী, এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে এমন বয়সী যুবক সকলেই ছিলো টার্গেট। ট্রাইব্যুনালের রায়গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হিন্দু ধর্মাবলম্বী যারা দেশ ছেড়ে চলে যাননি বা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধে অংশ না নিয়ে দেশে থেকে গিয়েছিলেন, তারা হত্যা, ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বা তাদেরকে জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিলো বা তাদের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে ধন-সম্পদ লুন্ঠণ করা হয়েছিলো। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘রাজনৈতিক’ পরিচয়ের কারণেও আওয়ামী লীগের কর্মীদের উপর গণহারে হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতন সংঘটিত হয়েছিলো এবং ১৯৭৩ সালের আইনে ‘রাজনৈতিক’ গোষ্ঠীকেও ‘বিশেষ গোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিলো, কিন্তু অদ্যাবধি বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে গণহারে হত্যা বা নির্যাতনের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ বা ‘জেনোসাইড’ হিসেবে গণ্য করে কোনো রায় প্রকাশিত হয়নি। ট্রাইব্যুনাল বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ‘নির্মূল’ (extermination) করার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, জেনোসাইড হিসেবে নয় (চৌধুরী মঈনউদ্দিন এবং অন্যান্য এবং মতিউর রহমান নিজামী)

শান্তি বাহিনী, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও আল-মুজাহিদ বাহিনীর উর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দের দায় নির্ধারণ এবং তার ভিত্তিতে তাদের দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেবার ক্ষেত্রেও প্রসিকিউশন মুন্সিয়ানা দেখিয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দক্ষতার কারণে অনেক পুরাতন দলিল-দস্তাবেজ, যেমন: পাকিস্তান পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের পাক্ষিক রিপোর্ট রংপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের থেকে উদ্ধার করা হয়েছিলো। এই রিপোর্ট জামায়াতে ইসলামীর ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ, যেমন: গোলাম আযম, আলী আহসান মো: মুজাহিদ, নিজামী, মীর কাশেম প্রমুখের বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল যৌথ দায়বদ্ধতা বা Joint Criminal Enterprise -এর তত্ত্ব বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। যখন কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি যৌথভাবে একটি দলের অংশ হিসেবে কোনো অপরাধ সংঘটিত করে, তখন তিনি সেই অপরাধের জন্য দলের অন্য সবার সাথে সমানভাবে দায় বহন করেন এবং দলের সবার একই শাস্তি হয়ে থাকে। মীর কাসেমের  মামলায় তাকে চট্টগ্রামের মহামায়া হোটেলে স্থাপিত টর্চার সেলের প্রধান হিসেবে দেখতে পাই এবং এর প্রধান হিসেবে ঐ টর্চার সেলের সব ঘটনার জন্যই তাকে দায়ী করা হয়। একইভাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর  মামলায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত গহীরা গ্রামে তিনি নিজে ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে যৌথভাবে গণহত্যা সংঘটিত করার জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। এই রায়গুলো অবশ্যই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য ট্রাইব্যুনালে নজির হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

৪.

উপস্থিত সুধিমন্ডলী, আজকের প্রধান অতিথি বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতি ও সম্মানিত সভাপতি, আমি আমার বক্তব্যের একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। এ পর্যায়ে আমি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আমার ভাবনা গুলো জানাবো।

‌ বর্তমানে একটি ট্রাইব্যুনালে ৩০টি মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং একটি মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। এই মামলাগুলোতে আনুমানিক ২০০ জন অভিযুক্ত আসামি রয়েছেন। এই মামলাগুলোতে সাক্ষ্য প্রদান করবেন ২০০ থেকে ২৫০ সাক্ষী। তদন্ত সংস্থার কাছে আরো ৫০০ থেকে ৬০০ মামলা তদন্তের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। মামলা সমূহের আসামি এবং সাক্ষী সকলেই এখন ৭০-ঊর্ধ্ব। প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়তো আর তিন চার বছর পর এদের কাউকেই আমরা বিচারের জন্য পাবো না। অথচ ভুক্তভোগীদের বিচার পাওয়ার অধিকার তখনও অপূর্ণ থেকে যাবে।  তাই খুব দ্রুততম সময়ে বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত করা প্রয়োজন।

আপনার অবগত আছেন যে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ ও ২ চলমান ছিল। পূর্বের ন্যায় দুইটি বা প্রয়োজনে তিনটি ট্রাইবুনাল করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে চলমান মামলাগুলো নিষ্পন্ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে যাবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি বা সত্য জানার অধিকার অপূর্ণ থেকে যাবে। এই বিচারের বিরুদ্ধে দেশে ও বিদেশে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে, বিচারক ও প্রসিকিউটরদের বাড়িতে হামলা হয়েছে, সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে, গুম করা হয়েছে,এমনকি দুজন সাক্ষীকে হত্যাও করা হয়েছে। এতদসত্ত্বেও, ট্রাইব্যুনালের বিচারক, প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থা অত্যন্ত সাহস, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে এই বিচারকার্য পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছেন।

আমরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি- ২০১৫ সালে থেকে ’৭১- এর গণহত্যাকারীদের চলমান বিচারের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মন্থরতা ও জটিলতা দেখা দিয়েছে। বিদগ্ধজন অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করেন যে, ২০১৫ সালের শেষের দিকে দু’টি ট্রাইব্যুনালের ভেতর একটির কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায় এবং বিচারিক কার্যক্রম অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা আসে। নির্মূল কমিটি ও সমমনা অন্যান্য নাগরিক সংগঠনের প্রবল বাধার কারণে বর্তমান ভবন থেকে ট্রাইব্যুনাল সরিয়ে নেয়া সম্ভব না হলেও এই সব মামলার আপিল শুনানি করার ক্ষেত্রে কোনো গতি ফিরে আসেনি। এর ফলে আপনজনদের হত্যার বিচার না পেয়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবারের সদস্যরা সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করছেন, অন্যদিকে গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীরাও শাস্তি না পেয়েই মারা যাচ্ছেন যা আইনের শাসনের শুধু পরিপন্থী নয়, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা ও মর্যাদার প্রতিও আঘাতস্বরূপ।

মাননীয় প্রধান বিচারপতি, আপনি নিজেও একসময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই বিচারের গুরুত্ব সর্ম্পকে আপনি অবগত আছেন। ট্রাইব্যুনাল ব্যক্তি হিসেবে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় গণহত্যাকারী ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীর বিচার করলেও এখন পর্যন্ত গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী সংগঠনসমূহ এবং ‘ ৭১- এ পাকিস্তানি হাইকমান্ডের বিচার কার্যক্রম আরম্ভ হয়নি।

আজকের বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে, ’৭১-এ সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার যতটা সম্ভব সম্পূর্ণ করার জন্য কয়েকটি প্রস্তাব রাখতে চাই। প্রথমত: স্থগিত দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত: আপিলের জটিলতা নিরসনের জন্য আপিল বিভাগে আরও বিচারপতি নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি অপেক্ষমাণ মামলাগুলি দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত: কম্বোডিয়া ও অন্যান্য কয়েকটি দেশে আন্তর্জাতিক অপরাধের মামলায় আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে দ্রুত আপিল শুনানি নিষ্পত্তি করেন। বাংলাদেশের মতো কোথাও এসব ট্রাইব্যুনালের মামলার আপিল শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টে যেতে হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কম্বোডিয়ার মতো আপিলের ব্যবস্থা করা হলে ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা যাবে। চতুর্থত: পুরানো  হাইকোর্ট ভবনে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আরম্ভ হওয়ার পর এই বিচার কার্যক্রমের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের প্রতি আবেদন করা হয়েছিলো যে – মামলার সকল কার্যবিবরণ ও দলিলপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার জন্য যাতে করে বিচারকার্য শেষ হওয়ার পর নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের প্যালেস অব জাস্টিসের মতো আমাদের ট্রাইব্যুনালের বর্তমান ভবনটি জাদুঘর ও আর্কাইভে রুপান্তরিত করা যায়। এর ফলে আগামী প্রজন্ম ও বিশ্ববাসী ‘৭১- এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতার পাশাপাশি জানতে পারবে কী ধরনের প্রতিকূলতার ভেতর এবং কী ধরনের মেধা ও দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশ গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হওয়ার ৪০-৫০ বৎসর পরও সাফল্যের সঙ্গে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পেরেছে।

এতক্ষণ ধৈর্য ধরে আমার বক্তব্য শোনার জন্য উপস্থিত সকলকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।